অনলাইনে হেডিং দৌরাত্ম

opjpjre
হারুন উর রশীদ:
অলরাউন্ডার সাকিব আল আহসান। ২২ সেপ্টেম্বর সকালে হেলিকপ্টারে উড়ে গেলেন কক্সবাজার। বিজ্ঞাপনের শ্যুটিং-এ। সাথে নাকি স্ত্রী শিশিরও আছে! এটাইতো অনেক বড় খবর! তারপর যদি সেই হেলিকপ্টার সাকিবকে নামিয়ে ঢাকা ফেরার পথে বিধ্বস্ত হয় তাহলে সংবাদ মাধ্যমকে আর পায় কে? তাইতো দেশের ‘আলো ছাড়ানো দৈনিক’ তাদের অনলাইন ভার্সনে শিরোনাম করলো- ‘ ভাগ্যক্রমে বেঁচে গেলেন সাকিব’। পরে হয়তো তাদের মনে হয়েছে এই বাঁচার মধ্যে কেউ যদি মৃত্যু শব্দটি আবিস্কার করে ফেলেন! তাই কিছু পরে শিরোনাম বদলে করা হল-‘অল্পের জন্য রক্ষা পেলেন সাকিব’।
শেষ পর্যন্ত এই আলো ছাড়ানো দৈনিকটি তাদের প্রিন্ট ভার্সনে আলো ছাড়ানো বন্ধ করে একটি ‘ননক্রিয়েটিভ’ শিরোনাম দেয়। সকালে সেই শিরোনাম পড়ে আমি প্রথমে কিছুটা বিভ্রান্ত হলেও পরে বুঝতে পারি এটা আসলে ‘ অল্পের জন্য সাকিবের প্রাণে বেঁচে যাওয়ারই’ খবর। শিরোনাম আলাদা-‘ সাকিবকে নামানোর ১৫ মিনিটের মধ্যে বিধ্বস্ত হেলিকপ্টার’।
একই পত্রিকার একই খবরের সংশোধিত তিনটি শিরোনাম এবার পাশাপাশি পড়ুন-
১.ভাগ্যক্রমে বেঁচে গেলেন সাকিব
২.অল্পের জন্য রক্ষা পেলেন সাকিব
৩. সাকিবকে নামানোর ১৫ মিনিটের মধ্যে বিধ্বস্ত হেলিকপ্টার
প্রথম শিরোনামটি মনে হয় ভাগ্য বিশ্বাসীদের জন্য। দ্বিতীয়টি ‘সাবধানের মার নেই’ এমন কিছুর জন্য। আর তৃতীয়টি ‘আহারে সাকিব না নেমে আর ১৫ মিনিট আকাশে খাকলেই হয়ে যেত! ইস!’।
ওই হেলিকপ্টার বিধ্বস্ত হয়ে যে একজন নিহত হয়েছেন তা কিন্তু তিন শিরোনামের কোনটিতেই নেই।
আলো ছড়ানো পত্রিকাটির অনলাইন ভার্সনের খবরটির ইন্ট্রো এবার তুলে ধরছি-
‘একটুর জন্য সকালবেলাতেই বড় এক দুঃসংবাদ শোনার হাত থেকে বেঁচে গেল বাংলাদেশ। আজ সকালে কক্সবাজারের ইনানি সৈকতে একটি হেলিকপ্টার বিধ্বস্ত হয়েছে। এই দুর্ঘটনায় একজন নিহত ও তিনজন আহত হওয়ার খবর পাওয়া গেছে। অলরাউন্ডার সাকিব আল হাসানকে কক্সবাজারে পৌঁছে দিতেই উড়ে গিয়েছিল হেলিকপ্টারটি।’
এই ইন্ট্রো পড়ে আমরা কি বুঝব! দুর্ঘটনার সময় কি সাকিব হেলিকপ্টারে ছিলেন? তিনি কোথায় ছিলেন ? ইন্ট্রো পড়ে মনে হয় সাকিব হেলিকপ্টারেই ছিলেন!
aa18e7a5ec5018f6a644597c2b9f9bdc-57dd099d3f332
এবার আমরা সংক্ষেপে প্রকৃত খবরটি একটু জেনে নিই-
২২ সেপ্টেম্বর সকালে কক্সবাজারের আকাশে একটি হেলিকপ্টার বিধ্বস্ত হয়ে শাহ আলম নামে একজন নিহত এবং পাইলটসহ পাঁচজন আহত হয়েছেন। হেলিকপ্টারটি অলরাউন্ডার সাকিব আল আহসানকে কক্সবাজারে নামিয়ে ঢাকায় ফেরার পথে এই দুর্ঘটনা ঘটে। সাকিব একটি বিজ্ঞাপন চিত্রে শ্যুটিং-এর কাজে কক্সবাজার গেছেন।
আরও কিছু তথ্য
১.সাকিব গেছেন কক্সবাজারে একটি হেলিকপ্টারে। সাকিব হেলিকপ্টারে থাকা অবস্থায় কোন দুর্ঘটনা ঘটেনি।
২. এমন নয় যে ওই হেলিকপ্টারেই সাকিবের কিছুক্ষন পরই ফেরার কথা ছিল তবে তিনি কোনো কারণে ফেরেননি।
৩. এমনও নয় যে হেলিকপ্টারটি ছিল ত্রুটিপূর্ণ, যেকোন সময় দুর্ঘটনা ঘটতে পারত।
৪.আহত পাইলট জানিয়েছেন, ফেরার সময় কয়েকজন হেলিকপ্টারের জানালা খুলে সেলফি এবং ভিডিও করতে গেলে ভারসাম্য হারিয়ে দুর্ঘটনা ঘটে। তিনি বারণ করলেও তারা শোনেননি।
সাকিব হোটেলে কপাল আকাশে!
তাহলে সাকিব-এর এখানে ভাগ্য বা কপাল অথবা অল্পের জন্য রক্ষার বিষয়টি ঘটলো কিভাবে? সাকিবকে নামিয়ে দেয়ার ১৫ মিনিট পর হেলিকপ্টারটি বিধ্বস্ত হয় ইনানি বিচে। আর সাকিব তখন হোটেলে।
হেলিকপ্টারটি বিধ্বস্ত হওয়ার সময় সাকিব হোটেলে থাকলেও আলো ছড়ানো দৈনিকটি সাকিবের ভাগ্য নিয়ে গেছে আকাশের হেলিকপ্টারে। যদি ঢাকার আকাশে হেলিকপ্টারটি বিধ্বস্ত হতো তাহলে সাকিব হয়তো পত্রিকার গুণে ঢাকার আকাশে চলে আসতেন।
দৈনিকটি সাকিব বন্দনা নয়, ‘মার মার কাট কাট’ করতে গিয়ে খেই হারিয়ে ফেলে তাই যে মরেনি তাকে প্রায় মেরে ফেলেছে। আর যে আসলেই মরেছে তার কথা ভুলে গেছে। কারণ সাকিবকে বেঁচা যাবে। কোথাকার কোন শাহ আলম মরলেই বা কী , আর বাঁচলেই বা কী!
তবে তারা একদম বেসামাল হননি। দৈনিকটির ১৯ লাইনের লম্বা খবরের ১৮তম লাইনে অবশ্য বলা আছে দুর্ঘটনায় শাহ আলম নামে একজন নিহত হয়েছেন। তাহলে বোঝা যায় বেসামাল নয় সচেতনভাবেই তারা বেসামাল হয়েছেন- খবরকে শুধু ‘হট কেক’ পণ্য হিসেবে বেঁচার জন্য।
তিন দফা শিরোনাম পাল্টালেও শেষ পর্যন্ত তারা সাকিবকে দিয়েই শিরোনাম করেছে, একজন নিহত হওয়ার খবর কোনো শিরোনামে নেই। বিষয়টি এমন যে নাচতে যখন নেমেছি ঘোমটা দিয়ে লাভ কী? কেউ কেউ এখন এটাকে নাকি বলেন,‘করপোরেট চরিত্র’।
মাথায় কত প্রশ্ন আসে!
এখন একটি প্রশ্নের উত্তর আমার খুব জানতে ইচ্ছে করছে। প্রশ্নটি হল: সাকিব যদি ওই হেলিকপ্টার দুর্ঘটনায় আহত হতেন বা দুর্ঘটনার সময় হেলিকপ্টারে থাকতেন তাহলে কী শিরোনাম হতো? হয়তো এরকম হতো-‘ আজারাইরলও পরাজিত বিশ্বসেরা অলরাউন্ডার সাকিবের কাছে!’
আমরা মনে হয় সাকিবের যদি এখন কোন কারণে জ্বর বা মাথা ব্যথা হয় তাহলে শিরোনাম হবে- ‘অল্পের জন্য সাকিব প্রাণে বেঁচে গেলেও গায়ে প্রচন্ড জ্বর।’
সাকিবকে নিয়ে আরো যা হতে পারে
‘জন্মিলে মরিতে হব ’- তবুও আমরা সাকিব কেন, কারুর মৃত্যুই আমরা কামনা করিনা। তারপরও সবার মতো সাকিবেরও একদিন স্বাভাবিক মৃত্যু হবে। কেউই অমর নয়। যখন তার স্বাভাবিক মৃত্যু হবে, সেই মৃত্যুর খবরের জন্য আমি একটি আগাম শিরোনাম প্রস্তাব করছি- ‘হেলিকপ্টার বিধ্বস্ত হওয়ার শোক সইতে না পেরে অবশেষে অলরাউন্ডার সাকিবের মৃত্যু’।
এই মৃত্যু ৫০ বা ১০০ বছর পর হলেও সমস্যা নেই। কারণ মৃত্যু নিয়ে চুড়ান্ত ব্যবসা করতে হলে কিছু একটা রং তো লাগাতে হবে। তা না হলে হোটেলে থাকা সাকিবকে হেলিকপ্টার দুর্ঘটনার সঙ্গে যোগ করে কীভাবে লেখা হয়, ‘একটুর জন্য সকালবেলাতেই বড় এক দুঃসংবাদ শোনার হাত থেকে বেঁচে গেল বাংলাদেশ।’ তারা আসলে বলতে চেয়েছে,‘ অল্পের জন্য মরেননি সাকিব!’ যারা ব্যবসা করেন তারা এভাবেই মানুষকে মেরে ফেলে এবং বাঁচিয়ে দেয় ব্যবসার জন্য।
পাদটীকা: এই ব্যবসা অনেকেই করেন। আমি একটি পাঠকপ্রিয় দৈনিকের কথা বললাম। কেউ মনে কষ্ট পেলে আমাকেও কষ্ট দিয়েন।

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s