বিডিনিউজকেও প্রমাণ করতে হবে….

untitled-3

হারুন উর রশীদ:
বাংলাদেশের অনলাইন নিউজ পোর্টাল বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম বাংলাদেশের প্রাচীনতম দৈনিক ইত্তেফাককে কপিরাইট আইন ভঙ্গের দায়ে নোটিশ দিয়ে এখন আলোচনায়। বিডিনিউজ দাবী করছে ইত্তেফাকের অললাইন সংস্করণে সম্প্রতি তাদের কিছু নিজস্ব কনটেন্ট এবং ছবি অনুমতি ছাড়া ব্যবহার করা হয়েছে। আর এজন্য বিডিনিউজ আইনি নোটিশ পাঠিয়ে ১৫ দিনের মধ্যে আনুষ্ঠানিক ক্ষমা চাইতে বলেছে, অন্যথায় তারা মামলা করবে বলে জানিয়েছে।
এখন বাংলাদেশের সংবাদ মাধ্যম, মিডিয়া পর্যবেক্ষক এবং মিডিয়া ওয়াচডগসহ সাধারণ পাঠকদের কাছেও বিষয়টি আগ্রহের সৃষ্টি করেছে। কারণ এখানে বিডিনিউজ যেমন কপিরাইট আইন ভঙ্গের অভিযোগ করেছে। তেমনি তাকেও এটা প্রমাণ করতে হবে দাবী করা কনটেন্ট এবং ছবির কপিরাইট প্রকৃতই তার।
মঙ্গলবার (২৭.০৯.১৬)বিডিনিউজ-এ প্রকাশিত খবরটি এরকম-
অনুমতি ছাড়া কনটেন্ট ও ছবি ব্যবহারের মাধ্যমে কপিরাইট আইন ভঙ্গ করার অভিযোগে দৈনিক ইত্তেফাকের অনলাইন সংস্করণকে চিঠি দিয়ে সতর্ক করেছে বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম।
মঙ্গলবার পাঠানো এই চিঠিতে ‘আইন ভঙ্গের’ জন্য ইত্তেফাককে আনুষ্ঠানিকভাবে ক্ষমা চাওয়ার আহ্বান জানানো হয়েছে।
এতে সাড়া না দিলে ইত্তেফাকের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলেও হুঁশিয়ার করা হয়েছে চিঠিতে।
বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমের একজন মুখপাত্র বলেন, তাদের এসব কনটেন্ট সম্প্রতি ইত্তেফাকের অনলাইন সংস্করণে প্রকাশ করা হয়। এভাবে কনটেন্ট ব্যবহার কপিরাইট আইনের স্পষ্ট লঙ্ঘন। ইত্তেফাকের এই বেআইনি ও অবৈধ কর্মকান্ডের প্রমাণও বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম কর্তৃপক্ষের কাছে রয়েছে বলে জানান তিনি।
বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম কর্তৃপক্ষ আশা করছে, চিঠি পাওয়ার ১৫ দিনের মধ্যে ইত্তেফাক আনুষ্ঠানিকভাবে ক্ষমা চেয়ে তা তাদের নিউজ পোর্টালে প্রকাশ করবে। স্বীকার করবে যে ওই কনটেন্ট বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমের এবং তা অনুমতি ছাড়াই ব্যবহার করা হয়েছিল।’
বিশ্লেষণ কী বলে?
সবচেয়ে ভালো হতো যদি বিডি নিউজের আইনি নোটিশের অরিজিন্যাল কপি এবং যেসব কনটেন্ট এবং ছবির কথা বলা হয়েছে তার লিংক পাওয়া যেত। বিডিনিউজ তাদের এই খবরে সুনির্দিষ্ট দিন ও তারিখ ধরে এবং পাশাপাশি লিংক দিয়ে খবর পরিবেশন করেনি। তবে সব তথ্য প্রমাণ তাদের কাছে তা আছে বলে দাবী করেছে। কিন্তু একটি খবরের বড় বৈশিষ্ট্য হল সুনির্দষ্টতা- যা বিডিনিউজের কপিরাইট নোটিশের খবরটিতে অনুপস্থিত। তবে তারা প্রামাণ হিসেবে ক্যাপশানসহ সাতটি ছবি প্রকাশ করেছে। আর ছবিগুলো দেখে বোঝা যায় ঘটনাটি গত অগাস্টে অলিম্পিক গেমস-এর সময়ে। সম্ভবত: বিডিনিউজ দাবী করছে ওই সময়ে ইত্তেফাক অনলাইনে তাদের কিছু কনটেন্ট এবং ছবি ইত্তেফাক অনলাইন অনুমতি ছাড়া ব্যবহার করেছে।
কনটেন্টের কপিরাইট আসলে কার?
কনটেন্ট বললে আসলে আলাদা করে ছবি’র কথা বলতে হয়না। যা প্রকাশ বা ছাঁপা হয় তাই কনটেন্ট। তা টেক্সট, ছবি, ভিডিও, অডিও, গ্রাফিকস যেকোন কিছু হতে পারে। এখন বিডিনিউজ ইত্তেফাকের অনলাইনে প্রকাশিত কনটেন্ট যা তার নিজস্ব বলে দাবী করছে তার সে দু’ভাবে মালিক হতে পারে-
এক. নিজস্ব জনশক্তি ব্যবহার করে
দুই.স্বত্ত্ব বা ব্যবহার স্বত্ব ক্রয় করে
বিডিনিউজকে প্রমাণ করতে হবে যা সে নিজের বলে দাবী করছে তা তার প্রতিবেদক এবং ফটো সাংবাদিকের নিজস্ব কনটেন্ট অথবা বিডিনিউজ অন্য যেকোনোভাবে তার মালিকানা অর্জন করেছে।
আমরা ঠিক এখনো জানিনা অলিম্পিকের ওই ছবি এবং কন্টেন্ট বিডিনিউজের প্রতিবেদক ও ফটোগ্রাফাররা সরাসরি তৈরি করেছেন কিনা। না তারা অন্য কোনভাবে(ক্রয় বা বিনিময়) কপিরাইট অর্জন করেছেন।
সেটি না বুঝতে পারার কারণ হলো বিডিনিউজ নিজেও ওই ছবি এবং কনটেন্টের সূত্র উল্লেখ করেনি। বিশেষ করে ছবিগুলো কোনো বিদেশি সংবাদ মাধ্যম থেকে নেয়া, না বিডিনিউজের নিজস্ব ফটোগ্রাফারের তোলা তার উল্লেখ নেই।
ছবি বিশ্লেষণ-এক

cpmpare-1
উপরে পাশাপাশি দুটি ছবি দেখুন। অস্ট্রেলিয়ার মেয়েদের সুইমিংপুলে বিশ্ব রেকর্ড নিয়ে বাঁদিকে বিডিনিউজের ছাপা ছবি এবং কনটেন্ট-এ কোন সূত্রের উল্লেখ নাই। কিন্তু ডানদিকের ছবিতে দেখুন ছবি ও কনটেন্টের কপিরাইট কাদের। এএফপি’র গ্রেব্রিয়েল-এর তোলা ছবি। আমি লিংক দিচ্ছি এখানে ক্লিক করুন দেখবেন বিডিনিউজ ছবি ঘরে মোট সাতটি ছবি দিয়েছে। যার কোন সোর্স নেই। তাহলে প্রশ্ন এই ছবির কপিরাইট কিভাবে বিডিনিউজের হয়? এখানে টেক্সট-এরও সূত্র দেয়নি বিডিনিউজ।
ছবি বিশ্লেষণ-দুই

compare-2
ইত্তেফাকের কপিরাইট ভঙ্গের নোটিশ-এর খবরে বিডিনিউজ কিছু ছবির স্ক্রিণ শট দিয়েছে। হয়তো তাদের দাবি ওই ছবিগুলো অনুমতি ছাড়া ইত্তেফাকের অনলাইন ভার্সন ব্যবহার করেছে। এরমধ্যে অলিম্পিকের দ্রুততম মানবী ব্লুম-এর ছবিটি কার তা দেখা যাক। বাঁদিকে বিডিনিউজের ছবিটি দেখুন। কোন সোর্স ছাড়াই ব্যবহার করা হয়েছে। এবার ডান দিকে আন্তর্জাতিক সংবাদ মাধ্যমে দেখুন, ছবিটি রয়টার্স-এর এ্যালান বলডুইনের তোলা
বিডিনিউজের এই লিংক-এ দেখুন ছবিঘরে তারা ব্লুম-এর মোট সাতটি ছবি দিয়েছে, কিন্তু কোনটিরই সোর্স নাই। তাহলে এই ছবিগুলোর কপিরাইট কার, বিডিনিউজের? তারা টেক্সট-এরও সূত্র দেয়নি।
অনেক প্রশ্ন
যদি বিদেশি সংবাদমাধ্যম থেকে অনুবাদ করা বিডিনিউজ-এর টেক্সট কেউ হুবহু আবার কপি করে ছেঁপে দেয় তা অনৈতিক হবে । তবে আরও একটি প্রশ্ন সেখানে আসে যে, অনুবাদ করতে গিয়ে কপিরাইট ভঙ্গ হয়েছে কিনা। এর মানে হল যার কপিরাইট তার অনুমতি নিয়ে সেই টেক্সট অনুবাদ করা হয়েছে কিনা। ছবির ক্ষেত্রেও একই কথা আমি কপিরাইট দাবী করলে ছবির মালিক আমাকেই হতে হবে। অন্যের ছবির কপিরাইট আমি কোনোভাবেই দাবী করতে পারিনা। আমি যদি অন্যের ছবি অনুমতি না নিয়ে ব্যবহার করি সেই ছবি আবার আরেকজন ব্যবহার করলে তাতে আমিতো আর কপিরাইট ভঙ্গের অভিযোগ করতে পারিনা। আর আমি যদি ছবি কিনে থাকি তাহলে ছবিরতো সূত্র থাকবে। একই কনটেন্ট এবং ছবি’র ব্যবহার স্বত্ত্ব একাধিক প্রতিষ্ঠানের কাছেও বিক্রি হতে পারে।
কপিরাইট , কার রাইট?
এটা সত্য যে কেউ একজন বিদেশি সংবাদ মাধ্যম বা সংবাদ সূত্র থকে কষ্ট করে একটি খবর অনুবাদ করে ছাঁপলেন। আবার কেউ হয়তো সেই কষ্টের ধারে কাছেও না গিয়ে সেই অনুবাদই হুবহু বা একটু এদিক ওদিক করে ছেঁপে দিলেন। এরকম ঘটনা ঘটছে। আবার কেউ হয়তো ঘটনাস্থলে না গিয়েই আরেকজনের প্রতিবেদনের তথ্য নিয়ে নিজের মত আপন করে নিলেন। তাই এখন কপি পেস্ট শব্দটি বেশ শোনা যাচ্ছে।
দেশীয় সংবাদের কনটেন্ট এবং ছবি’র ক্ষেত্রে এটা অনেকটাই স্পষ্ট যে, কপি পেস্ট চলছে। কপিরাইটের লঙ্ঘন হচ্ছে। আর তা কারা করছে তাও আপনারা বুঝতে পারছেন।
কিন্তু আন্তর্জাতিক খবর এবং ছবির ক্ষেত্রে কী হচ্ছে? ক’টা খবর আর ছবি অনুমতি নিয়ে আমরা ছাঁপছি। ক’টা খবর বা ছবি আমরা কিনে নিচ্ছি? ভাল অনুবাদক হলেই কী বাইরের সব খবর আমার হয়ে যাবে? ক্রেডিট দিয়ে ছাঁপার একটা সাধারণ নীতিমালা গড়ে উঠেছে। কিন্তু ক্রেডিট দিয়ে ছাঁপলেই কি সবকিছু ছাঁপা যায়? আর ছবি? তারতো কোনো ক্রেডিটই দেয়া হয়না।

copyright-cutout2
কেউ কৌশলে আবার কেউ প্রকাশ্যে!
সুতরাং সময় আসছে। প্রশ্ন উঠছে। আমি আজ কপিরাইটের প্রশ্ন তুলছি। কাল আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমও বিষয়টি আমলে নেবে। নিতে হবে। কারণ তা না হলে কপি পেস্টারদেরই পোয়াবারো হবে। সংবাদ মাধ্যমকে বিনিয়োগ করতে হবে। ব্যবসা করতে হলে খরচ করতে হবে। আর প্রয়োজন হলে তৈরি করতে হবে নিউজ সিন্ডিকেট। তাহলে যেমন স্বচ্ছতা থাকবে । থাকবে খবরের যথার্থতা। নয়তো যেমন কপি রাইটের মামলা খেতে হবে । তেমনি ভুয়া নিউজ ছেঁপে ধরাও খেতে হবে। যেমন বঙ্গবন্ধুর খুনী নূর চৌধুরীকে কানাডা থেকে বহিস্কারের খবর কোলকাতার আনন্দবাজার থেকে কপিপেস্ট করে ধরা খেয়েছে বাংলাদেশের অনেক সংবাদমাধ্যম।
কলাবাগান, ঢাকা
২৮.০৯.২০১৬

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s