ছাত্রলীগের ‌‌‘জঙ্গি’ নেতার চাপাতির নিচে নারী

 

8e6e256d1a74baeab96a4b65325f5b33-57f34aee8af01

হারুন উর রশীদ:

ভয়াবহ দৃশ্য! প্রকাশ্যে দিনের আলোয়, সদর রাস্তার ওপর এক কলেজ ছাত্রীকে চাপাতি দিয়ে বিরামহীন কোপাচ্ছে এক দুর্বৃত্ত। ছাত্রীকে শেষ করে না দেয়া পর্যন্ত যেন থামবেনা ওই দুর্বৃত্ত। চারদিকে নিরাপদ দূরত্বে থেকে পথচারীরা চিৎকার করছেন। কেউ করছেন হায়! হায়! কেউ বলছেন ‘ও মাই গড’! তারপরও বিকার নেই ওই দুর্বৃত্তের। যন্ত্রের মত কোপাচ্ছে! এটি সাধারণ চোখে আমাদের দেশে জঙ্গিরাই করে। চাপাতি দিয়ে নৃশংসভাবে কুপিয়ে হত্যা মানে জঙ্গি, জেএমবি, আনসারুল্লাহ বাংলা টিম বা হালে নব্য জেএমবি’র কাজ।

কিন্তু না! এটা কোনো প্রচলিত জঙ্গি বা জঙ্গি গ্রুপের কাজ নয়। এটা সিলেট শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (শাবি) ছাত্রলীগের সহসম্পাদক বদরুল আলম-এর অপকর্ম। আর যাকে চাপাতি দিয়ে কোপানো হয় তিনি খাদিজা বেগম নার্গিস। সিলেট মহিলা কলেজের ছাত্রী। তাকে এখন ঢাকার স্কয়ার হাসপাতালে লাইফ সাপোর্টে রাখা হয়েছে। তিনি আছেন জীবন-মৃত্যুর সন্ধিক্ষনে। আর এই জঙ্গি স্টাইলে চাপাতি দিয়ে কোপানোর ঘটনা ঘটে সোমবার বিকেলে সিলেটের এমসি কলেজের মসজিদের পিছনে।

14479773_627691687401657_4205660456166417658_nছাত্রলীগ নেতা বদরুল ভেবেছিল নার্গিস মরে গেছে। তার নিথর দেহ ফেলে সে যখন পালানোর চেষ্টা করে, তখন জনতা তাকে ধরে গণপিটুনি দিয়ে পুলিশে দেয়। এই বর্বর এবং নৃশংস ‘জঙ্গিপনার’ ভিডিও এবং ছবি ছড়িয়ে পড়েছে সামামাজিক যোগাযোগ মাধ্যসসহ সংবাদ মাধ্যমে। তারমধ্যে ৪৬ সেকেন্ডের একটি ভিডিও ভাইরাল হয়েছে। আর সেই ভিডিওতে স্পষ্ট যে ওই ছাত্রলীগ নেতা যখন কোপাতে শুরু করে তখন সেখানে উপস্থিত কয়েকজন দৌড়ে নিরপদ দূরত্বে চলে যায়। বদরুল যখন তাকে কোপাতে থাকে তখন তারা নিরাপদ দূরত্বে অবস্থান নেয়। কেউ কেউ ছবি তোলে। মোবাইল ফোনের ক্যামেরায় ভিডিও করে।
এক মিনিট বা তার বিছু বেশি সময় ধরে নার্গিসকে কোপানো হয়। আর বদরুল ভয়ঙ্কর দানবের মত কোপের পর কোপে রক্তাক্ত করে নার্গিসকে। তার চিৎকার, আর্তনাদ বদরুলের মনে একটুও দাগ কাটেনি। যেভাবে জঙ্গিরা মিশন শেষ করার জন্য মরিয়া থাকে সেরকম।
ছাত্রলীগ নেতা বদরুল চাপতি দিয়ে জঙ্গিদের মত নার্গিসকে কুপিয়েছে প্রেম নিবেদনে ব্যর্থ হয়ে। তিনি ছাত্রলীগ নেতা। ক্ষমতাধর। তার প্রেম নিবেদনকে উপেক্ষা? এই দু:সাহসের জবাব বদরুল দিয়েছে জঙ্গি চাপাতি দিয়ে।
বদরুল কেন জঙ্গি?
এতক্ষণে হয়তো আপনাদের মনে প্রশ্ন উঠেছে যে, আমি ছাত্রলীগ নেতাকে কেন জঙ্গি বলছি। কেউ হয়তো বিরক্ত হয়ে আমাকে একচোঁখা বলে ভর্ৎসনাও করছেন। আবার কেউ হয়তো আমাকে বাগে পেলে একহাত দেখে নেয়ার চিন্তাও করতে পারে। তবে দয়া করে আমার যুক্তিগুলো শুনুন। শুনুন কেন আমি ছাত্রলীগ নেতা বদরুলকে জঙ্গি বলছি।

১.বদরুলের টার্গেট ছিল নার্গিসকে হত্যা করা।

২.বদরুলের পক্ষে পিস্তল বা রিভলবার দিয়ে গুলি করে মারা সহজ ছিল। সে ছাত্রলীগের বড় নেতা। দু’একটি পিস্তল বা রিভলবার তার কাছে ডাল-ভাত! কিন্তু সে তা করেনি, চাপাতি দিয়ে কুপিয়েছে।

৩. চাপাতি দিয়ে কুপিয়ে বা ধারালো অস্ত্র দিয়ে জাবাই করা জঙ্গিদের একটা স্টাইল। এটা করে তারা নৃশংসতা ও ক্ষমতা প্রকাশের জন্য। যার সঙ্গে পুরোপুরি মিলে যায় বদরুলের চাপাতি মিশন।

৪. জঙ্গিরা টার্গেটে অবিচল থাকে। মিশন শেষ করতে চায় যেকোন উপায়ে। বদরুলও প্রকাশ্য দিবালোকে অত মানুষের সামনে চাপাতি দিয়ে কোপাতে একটুও ভীত ছিলনা।

৫. বদরুল পরিকল্পিত উপায়ে ঠান্ডা মাথায় নার্গিসকে হত্যার জন্য চাপাতি দিয়ে কোপায়। যা এরইমধ্যে পুলিশ জানিয়েছে। এটা জঙ্গিদের স্টাইল।

৬. জঙ্গিরা তাদের পথের নয় বলে যাদের মনে করে তাদের দুনিয়া থেকেও সরিয়ে দেয়। বদরুলও তাই । তার মতে সায় না দেয়ায় নার্গিসকে দুনিয়া থেকে সরিয়ে দেয়ার সিদ্ধান্ত নেয় সে।

14522973_10207471706174931_9183802698066089497_n
উপসংহার
জঙ্গিবাদ যে শুধু ধর্মের নামে হয় তা নয়। এটা কোন গোষ্ঠী বা ব্যক্তির ক্ষেত্রেও হতে পারে। আচরণই বলে দেবে কে জঙ্গি আর কে জঙ্গি নয়। এখন কেউ প্রশ্ন করতে পারেন জঙ্গিরাতো ‘জান্নাত’ পাওয়ার আশায় মানুষ হত্যা করে। বদরুল কী পাওয়ার আশায় নার্গিসকে কুপিয়ে হত্যার চেষ্টা করেছে। আমার জবাবা হল ধর্মীয় জঙ্গিবাদের পিছনে উদ্বুদ্ধকরণ প্রক্রিয়ায় জান্নাতের বিষয়টি হয়তো থাকে। কিন্তু যারা মাস্টারমাইন্ড তারা কিন্তু বিষয়টি জানে। তাদের টার্গেট কিন্তু ভিন্ন। বদরুল এখানে নিজস্ব মনোজগতেই জঙ্গি হয়ে উঠেছে। সে হয়েছে এক নৃশংস প্রতিশোধ পরায়ণ জঙ্গি। স্বাভাবিকভাবে দখলে ব্যর্থ হয়ে সে তার ক্ষতার প্রকাশ ঘটিয়েছে জঙ্গি স্টাইলে, চাপাতির কোপে, নৃশংসতায়। এটাই তাকে জঙ্গি প্রমাণের জন্য যথেষ্ঠ।

পাদটীকা:‘গঠনতন্ত্র অনুযায়ী ছাত্রলীগে নেই বদরুল’
এদিকে মঙ্গলবার দুপুরে ঢাকার স্কয়ার হাসপাতালে আহত নার্গিসকে দেখতে গিয়েীছলেন ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় কমিটির সাধারণ সম্পাদক জাকির হোসেন। তিনি দাবী করেছেন বদরুল ছাত্রলীগের কেউ নয়।
তিনি বলেছেন, ‘ছাত্রলীগের গঠনতন্ত্রে লেখা আছে কোনও কর্মী কাজে যোগ দিলে ও বিয়ে করলে তার সদস্যপদ অটোমেটিক বাতিল হয়ে যায়। আপনারা এরই মধ্যে দেখেছেন শাহজালাল বিশ্ববিদ্যালয়ের এক প্রেস রিলিজে বলা হয়েছে, বদরুল বিশ্ববিদ্যাল কোনও কর্মকাণ্ডে যুক্ত নয়। সে বর্তমানে সুনামগঞ্জের ছাতকের আলহাজ্ব আয়াতুর রহমান উচ্চা বিদ্যালয়ে শিক্ষক হিসেবে কর্মরত রয়েছে। সুতারাং সে গঠনতন্ত্র অনুযায়ী ছাত্রলীগের কর্মী নয়।’

কলাবাগান, ঢাকা
০৪.১০.২০১৬

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s