আসুন রক্তাক্ত নার্গিসের সঙ্গে আমারও একটা সেলফি তুলি!

selfuuu

হারুন উর রশীদ:
১.যুব মহিলা লীগের তিন নেত্রী স্কয়ার হাসপাতালে অস্ত্রপচারের পর নিবিড় পরিচর্যায় থাকা সিলেটের খাদিজা বেগম নার্গিসের সঙ্গে সেলফি তুলেছেন। আর তা ফেসবুকে পোস্ট করে তুমুল সমালোচনার মুখে পড়েছেন। ব্যাপক নিন্দা আর সমালোচনার মুখে তারা এরইমধ্যে সেই ছবিসহ পোস্ট-এর জন্য দু:খ প্রকাশ করেছেন। তবে পোস্ট থেকে সেলফি সরাননি!
২. তারা পোস্টের সেই ছবি প্রত্যাহার করলেইতো আর ল্যাঠা চুকে গেলনা। এরইমধ্যে তাদের তোলা সেলফি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ভাইরাল হয়ে গেছে। তাদের পোস্ট করা সেলফি’র সবকটি ছবিই ডাউনলোড করে ফেসবুক ব্যবহারকারীদের কেউ কেউ আবার রিপোস্ট করেছেন। সংবাদ মাধ্যম ফলাও করে তাদের সেই সেলফিসহ দু:খ প্রকাশের খবর ছেঁপেছে। ফলে যা হওয়ার তাই হয়েছে। অমানবিক এবং নিন্দিত সেলফি’র ছবি এখন সবার কাছে। ওটাকে আর বাতিল করা যাচ্ছেনা। তারা যদি এখন সেলফি পোস্ট থেকে প্রত্যাহারও করেন তারপরেও বাস্তবে প্রত্যাহার হচ্ছেনা।
৩.হাসপাতালে অচেতন নার্গিসের সঙ্গে যারা সেলফি তুলেছেন তারা হলেন অপু উকিল, সাবিনা আক্তার তুহিন এবং কোহেলি কুদ্দুস। এরমধ্যে তুহিন আবার এমপি। অপু উকিল সাবেক এমপি। তারা হাসপাতালে নার্গিসকে দেখতে গিয়ে বুধবার ওই সেলফি তোলেন। তাদের ব্যাখ্যা সবাইকে নার্গিসের খোঁজ জানানোর জন্যই তারা সেলফি তুলে তা ফেসবুকে পোস্ট করেছেন। তাদের একজন কোহেলি কুদ্দুস বলেছেন,‘ বার বার নার্গিসের মৃত্যুর গুজব ছাড়ানো হচ্ছে। তাই এই গুজব ভ্রান্তি নিরসনে তারা সেলফি তুলেছেন এবং তা পোস্ট দিয়েছেন।’
৪. যার যুক্তি তার কাছে। কিন্তু সাধারণ মানুষ তাদের এই সেলফি ‘উৎসবকে’ সহজভাবে নেননি। তাই তারা সমালোচনায় মুখর হয়েছেন। তারা এরমধ্যে অমনবিকতা দেখেছেন। তারা দেখেছেন এক যন্ত্রনাকাতর অচেতন নারীর সঙ্গে কপালে টিপ, ঠোঁটে লিপিস্টিক লাগানো সাজুগুজু করা তিন নারীর সেলফি। কেউ তার বাবার লাশের সঙ্গেও সেলফি করতে পারেন, শেষ সেলফি হিসেবে। সেটা তার ব্যক্তিগত ইচ্ছা, নৈতিকতা এবং রুচির ব্যাপার। তবে মানুষ সেটাকে কীভাবে নেয় সেটাও দেখার বিষয়। কারণ এর সঙ্গে মানবিক অনেক বিষয় জড়িত।
৫. আমরা যুব মহিলা লীগের তিন নেত্রীর সেলফি নিয়ে কেন সমালোচনা করছি? তার প্রধানত: দু’টি কারণ হতে পারে। প্রথমত: এধরণের সেলফি আমাদের মূল্যবোধের পরিপন্থী এবং অমানবিক। তারা স্থান-কাল-পাত্র বিবেচনা করেননি। দ্বিতীয়ত: তারা এই সেলফি ফেসবুকে পোস্ট করে একটি অমানবিক পরিস্থিতির সৃষ্টি করেছেন। তারা অচেতন নার্গিসকে প্রকারন্তরে তাদের প্রচারণার ঢাল হিসেবে ব্যবহার করেছেন।
সব অমানবিক কাজের সমালোচনা করতে তার প্রামাণ্য দলিল তুলে ধরতে হবে এমন কোন কথা নেই। তাইতো ভয়ঙ্কর দৃশ্য, তা যতই অমানবিক হোক তার ছবি ছাঁপা বা ভিডিও প্রকাশকেও অমানবিক হিসেবে বিবেচনা করা হয়। এখন যারা হাসপাতালে অচেতন নার্গিসের সঙ্গে তিন যুব মহিলা লীগ নেত্রীর সেলফি রিপোস্ট দিয়ে সমালোচনা করছেন তারাও কি একই ধরণের অমানবিক কাজ করছেন না?
৬. সিলেটে নার্গিসকে যখন বদরুল প্রকাশ্যে চাপাতি দিয়ে কুপিয়ে রক্তাক্ত করছিল তখন সেখানে অনেকেই ছিলেন। তারা কেউ এগিয়ে গেলে হয়তো এই পরিস্থিতির সৃষ্টি নাও হতে পারত। সেটা কেউ না করলেও নিরাপদ দূরত্বে দাড়িয়ে মোবাইল ফোনে ভিডিও করা এবং ছবি তোলার লোকের অভাব ছিলনা। আমরা সেটার সমালোচনা করছি। আবার সেই নৃশংস ভিডিও এবং ছবি ফেসবুকে শেয়ার করছি। সংবাদ মাধ্যম ছাঁপছে এবং প্রকাশ করছে। একেই বলে স্ববিরোধিতা। এখানে বলে রাখছি আমি নিজেও এই স্ববিরোধিতার বাইরে না।
৭. যেকোন হাসপাতালের নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে (আইসিইউ) দর্শনার্থীদের প্রবেশের সুযোগ থাকার কথা নয়। যদি চিকিৎসক মনে করেন তাহলে নিকটাত্মীয় বা বিশেষ প্রয়োজনে কাউকে ঢুকতে দিতে পারেন। আমার প্রশ্ন হল স্কয়ার হাসপাতালের দায়িত্বরত চিকিৎসকরা কীভাবে তিন যুব মহিলা লীগের নেত্রীকে আইসিইউতে ঢুকতে দিলেন নার্গিস ৭২ ঘন্টার নিবিড় পচির্যায় থাকা অবস্থায়! তাদের আবার সেলফি তোলারও সুযোগ দিয়েছেন। এটা কেমন হাপাতাল? তার কি তিন নেত্রীর ক্ষমতার দাপটকে অগ্রাহ্য করতে পারেননি? ওই তিন নেত্রী যে গোপনে ঢোকেনটি তা তো পরিস্কার। কারণ তাদের গায়ে আইসিইউ’র পোশাক আছে।

mp

সাবিনা আক্তার তুহিন,কোহেলি কুদ্দুস এবং অপু উকিল

৮. সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে নার্গিসের আরো একটি ছবি এখন ভাইরাল। বীভৎস সেই ছবিটি হল হাসপাতালে নার্গিসের অস্ত্রপচার পুর্ববর্তী ছবি। ওই ছবি কোনো চিকিৎসক বা তাদের সহযোগিতা ছাড়া তোলা অসম্ভব। সেটা আবার ফেসবুকে পোস্ট দেয়া হয়েছে। আর ফেসবুকে সেই ছবি কেউ কেউ শেয়ার করছেন। এর দায় দায়িত্ব কার?
৯. ছাত্রলীগ নেতা বদরুল অনেকের কপাল খুলে দিয়েছে, নার্গিসকে কুপিয়ে! এখন কেউ হাসপাতালে অচেতন নার্গিসের সঙ্গে সেলফি তুলে সামাজিক দায়িত্ব পালনের নামে নিজের ঢোল পেটানোর সুযোগ নিচ্ছেন। কেউ বীভৎস ছবি ফেসবুকে শেয়ার করে লাইক বাড়ানোর চেষ্টা করছেন। কেউ কোপানোর দৃশ্য ভিডিও করে, ছবি তুলে তা প্রচারে ব্যস্ত। কিন্তু নার্গিসের জন্য যেন আমরা কেউ নেই!
১০. এখন হয়তো আর সুযোগ পাওয়া যাবেনা। তবে সুযোগ করে দিলে হয়তো রক্তাক্ত নার্গিসের সঙ্গে সেলফি তোলার জন্যও কেউ কেউ এগিয়ে যেতেন। হয়তো অপারেশন থিয়েটারে ঢোকাতে কেউ বাধা দিতো আরেকটি সেলফি তোলার জন্য। ভাবতো মেয়েটি মরে গেলেতো আর সুযোগ পাওয়া যাবেনা, শেষ ফেলফিটা করে নিই, স্মৃতি হয়ে থাকবে!
১১. সাভারে রানাপ্লাজা ধসের পর বেওয়ারিশ লাশ দাফনের জন্য তৈরি করা কবরে দাড়িয়ে এক টেলিভিশন সাংবাদিককে পিটিসি দিতে দেখেছি। আর সেই পিটিসি’র ছবি তিনি ফেসবুকে পোস্টও করেছিলেন। অপারেশন থিয়েটারে এক রোগীর অস্ত্রপচারের সময় চিকিৎসকদের(!) একটি সেলফি বেশ কয়েক মাস ধরে ফেনুকে ভাইরাল হয়ে ঘুরছে। আরো আছে- কোরবানির পশুর সঙ্গে সেলফি, জবাই করার সময় রক্তাক্ত সেলফি, জবাই করার পর বুকের ওপর উঠে সেলফি। আবার কোথাও আগুন লাগলে সেই আগুনকে পিছনে রেখে সেলফি তোলার ধুম পড়ে যায় আজকাল। জানিনা এরপর হয়তো দেখবো বাবার লাশের সঙ্গে কোনো এক পুত্রের শেষ সেলফি!
১২. অতিরিক্ত সেলফি তোলার প্রবণতা একটি রোগ। আমেরিকান সাইক্রিয়াটিক অ্যাসোসিয়েশন (এপিএ) এই রোগের নাম দিয়েছে ‘সেলফিটিস’। তবে যুব মহিলা লীগের তিন নেত্রী সেই রোগে আক্রান্ত কিনা তা চিকিৎসকরাই ভালো বলতে পারবেন।
কিন্তু ছাত্রলীগ নেতা বদরুলের চাপাতির কোপের জীবনসংকটে থাকা নার্গিস-এর সঙ্গে সেলফি তুলে তিন যুব মহিলা লীগ নেত্রী তাদের ইমেজ বিল্ড আপের যে কৌশল নিয়েছিলেন তা বোঝা যায় সহজেই। কিন্তু হায়! কৌশলটি বুমেরাং হয়ে গেল!
কলাবাগান, ঢাকা
০৬.১০.১৬

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s