মণ্ডপে যেতে নাই বলে একশ্রেণি ধুয়া তোলে, একশ্রেণি সংখ্যালঘু নির্যাতন করে

42aaf9fcbd542bbd71325707d978982f

উদিসা ইসলাম:

 খুব ছোট বেলায় রাজশাহী শহরে যে বাসায় থাকতাম, ঠিক পাশে বড় মণ্ডপ হতো ‍দুর্গাপূজায়। এককিলোমিটারের ভিতর ৭টা। খেলতে খেলতে সেখানেই কাটতো পুরোটা উৎসবের সময়।

ওদের সবকিছু আমরা করতে পারব না, কিন্তু আবার অনেককিছু উৎসব হিসেবেই করা যাবে এমন পাঠ তখন প্রায় সবারই জানা ছিল। যদিও ধর্ম যার যার, উৎসব সবার মতো বাণী লিখে রাখতে হতো না।

আমাদের বিল্ডিংয়ে দুটি সনাতন ধর্মাবলম্বী পরিবার, আশেপাশে আরও ছিল।

ধরেন, একসাথে খেলছি, আমার বাবা আমাদের ভিতর দিয়ে গেলে একটু রাস্তা করে দিয়ে (গুরুজনদের এমন রাস্তা করে দেওয়ার চল পাড়ায় মহল্লায় ছিল) সনাতন ধর্মের বন্ধুরা সালাম দিয়ে চাচা কেমন আছেন জিজ্ঞেস করতো। ওদের কারোর বাবার ক্ষেত্রে আমরা কাকা বলে নমস্কার দিতাম।

আমাদের দুপুরটা ওদের ওখানে কাটলে তাদের সন্ধ্যেটা আমাদের বাসায় কাটে। রোজ। জানতে শুরু করি, কোনপূজোয় নাড়ু হয়, কোন পূজোয় কী ভোগ হয়, কোন পূজোকে সার্বজনীন বলি। এতক্ষণে পড়তে পড়তে যারা গেলগেল রব তুলছেন, এই বুঝি ‘হিন্দুয়ানী শেখা প্রগতিশীল’ হয়ে গেলো তাদের উদ্দেশ্যে বলি: বাসায় এলার্ম ক্লকনা থাকায় কয়েকদিন ভোরে সেহরি খাওয়ার ডাক কিন্তু কাকা কাকীমাই দিয়েছেন। দোতলা থেকে ভোররাতে চিৎকার, এই ওঠ, আর আধাঘন্টা কিন্তু। তেমনই, কোরবাণী ঈদের গরুর মাংস সিড়ি দিয়ে ওঠা নামা করানোরসময় তাদের ছোঁয়াছুয়িতে বাতিক ছিল না যেমন তেমনই এই ঈদের রাতে তারা নিমন্ত্রিত। খাসির মাংস, পোলাও,বেগুন ভাজি, মাছ ভাজি, পিয়াজ ছাড়া নিরামিষ আর মিঠাই।

 এই আমার ছেলেবেলা। এরপর, বিশ্ববিদ্যালয়ে ঢুকেছি মাত্র। একদিন এক সহপাঠী বলল, তোর নামের শেষেইসলাম না থাকলে তুই হিন্দু না মুসলিম বোঝা দায় হতো। প্রশ্নাতীতভাবে কিছু মেনে নেওয়ায় আমার ঘোরআপত্তি। জিজ্ঞেস করলাম: কেন? কী দেখে? আমিতো শাঁখা সিঁদুর পরি না। জিন্স-পাঞ্জাবি পরি। সে হেসেবলেছিল: চলনে কেমন কী জানি আছে। আবারও জিজ্ঞেস করলাম: কেমন? সে বলল, ভয় না পাওয়ার একটা ধরণআছে না? তোর সাহস আছে নাই আলাপ করছি না, কিন্তু হাঁটলে, বসলে সাহসী দেখায়। একটু থেমে জানতেচেয়েছিল: তুই পূজোয় হিসেব করে পোষাক পরিস, ওদেরই মতো, মণ্ডপে যাস, কেন?

 ততক্ষণে পরিস্কার হওয়া গেল বিষয়টা। সাহস টাহস বিষয় না, বিষয় হলো, ‘অন্য একটি ধর্মের বিষয়ে জানাএবং সংহতি জানিয়ে তার সাথে মিলিয়ে আচরণ’। আমি সেদিন তাকে যে উত্তর করেছিলাম, আজও সেই জবাবটাইআছে ধরা: আমি মণ্ডপে যাই কারণ যে প্রতিবেশীদের নিয়ে আমি বেড়ে উঠেছি তাদের সাথে আমার আত্মারসম্পর্ক, সে হিন্দু বা খ্রিস্টান যাই হোক, তার জীবনটায় আমি আছি। তার সুখে দুখে সেভাবেই আমি থাকতে চাই,যেমন করে তারা থাকতে অনেকসময় বাধ্য হন আমি সংখ্যাগুরু বলে। আমি মণ্ডপে যাই কারণ দেবী দুর্গারমমতাময়ী চেহারাতে যে তেজ দেখতে পাই, আশেপাশে তেমন চেহারা আমি দেখতে চাই বলে। আমি মণ্ডপে যাইআমার সনাতন বন্ধুরা যায়, তাদের সাথেই আমার বেড়ে ওঠা বলে।

আর বড় হয়ে যোগ হয়েছে, আমি মণ্ডপে যাই কারণ, মণ্ডপে যেতে নাই বলে একশ্রেণি ধুয়া তোলেন আর একশ্রেণি  সংখ্যালঘু নির্যাতন করেন। যার কোনটাইতেই আমার সায় নাই।

উদিসা ইসলাম,ঢাকা

১১.১০.২০১৬

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s