হাসতে পারলেন না সুহাসিনী

14650502_10154672639809216_8527254921560234760_n

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সাক্ষাৎকার নিচ্ছেন দ্য হিন্দুর সাংবাদিক সুহাসিনী হায়দার (ছবি: প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ সহকারী মাহবুবুল হক শাকিলের ফেসবুক থেকে নেয়া)

হারুন উর রশীদ:

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বিশেষ সহকারী মাহবুবুল হক শাকিল আগেই খবরটি দিয়েছিলেন তাঁর ফেসবুক পেজে। তিনি অক্টোবরের ১২ তারিখ এক পোস্টে জানান, বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার একটি বিশেষ সাক্ষাৎকার নিয়েছে ভারতীয় ইংরেজি পত্রিকা দ্য হিন্দু। আর দ্য হিন্দুর পক্ষে সাক্ষাৎকারটি গ্রহণ করেছেন পত্রিকাটির কূটনৈতিক সম্পাদক সুহাসিনী হায়দার। আর তখন থেকেই আমরা আগ্রহ ছিল সাক্ষাৎকারটি পড়ার। অপেক্ষায় ছিলাম কবে ছাঁপা হবে। আজ(১৪.১০.১৫) দ্য হিন্দুর অনলাই সংস্করনে সাক্ষাৎকারটি ছাাঁপা হয়েছে। শিরোনাম:We feel frustrated with Pak., says Hasina

কিন্তু প্রধানমন্ত্রীর সাক্ষাকারের ফুল টেক্সট যদি কেউ পড়েন তাহলে দেখবেন দ্য হিন্দু একটি নন প্রফেশনাল শিরোনাম করেছে। তারা যা চেয়েছিল বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর মুখ থেকে শুনতে তা না শুনতে পেয়ে হতাশ হয়েই এই শিরোনাম করেছে বলে আমার মনে হয়েছে। তারা যেটা নিয়ে শিরোনাম করেছে সেটা নিয়ে অবশ্যই প্রধানমন্ত্রী কথা বলেছেন। তবে কেউ যদি নিউজ ভ্যালু হিসেব করেন তাহলে ওটা কোনোভাবেই শিরোনাম হতে পারেনা। আর প্রধানমন্ত্রী সাক্ষাৎকারে তাঁর যে কূটনৈতিক দক্ষতা এবং রাষ্ট্রনায়কের ছাঁপ রেখেছেন তা ওই শিরোনামে প্রতিফলিত হয়নি।
দ্য হিন্দু’র কূটনৈতিক সম্পাদক সুহাসিনী হায়দার-এর প্রশ্নগুলো যদি কেউ মনোযোগ দিয়ে পড়েন তাহলে এটা বুঝতে অসুবিধা হবেনা যে দ্য হিন্দু চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং-এর ঢাকা সফর নিয়ে বেশ কায়দা করে প্রশ্ন করেছে। বলতে চেয়েছে বাংলাদেশ বাংলাদেশ চীনের দিকে ঝুঁকছে। আর পাকিস্তানের সীমান্তে ঢুকে ভারতের কথিত সার্জিক্যাল স্ট্রাইকের সমর্থন নিতে চেয়েছে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর কাছ থেকে। কিন্তু কী বলেছেন আমাদের প্রধানমন্ত্রী?
দ্য হিন্দুর প্রশ্ন ছিল, সীমান্তের নিয়ন্ত্রণ রেখা পেরিয়ে পাকিস্তানে পরিচালিত অভিযান(ভারতের) বাংলাদেশ সমর্থন করে কিনা?
জবাবে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘আমি মনে করি, দুই দেশের উভয়েরই নিয়ন্ত্রণরেখার সীমার ভেতরে থাকা উচিত। আর এতেই কেবল শান্তি আসতে পারে।বাংলাদেশ সীমান্ত-রেখা লঙ্ঘনের বিরোধী।’
এরপর দ্য হিন্দুর সুহাসিনী কায়দা করে একই বিষয়ে আরেকটি প্রশ্ন করেন। আর তা হলো- মিয়ানমারের সীমান্তে প্রবেশ করে ভারতের গত বছরের জঙ্গিবিরোধী অভিযান বাংলাদেশ সমর্থন করে কিনা?
জবাবে শেখ হাসিনা বলেন, ‘আমি দৃঢ়ভাবে মনে করি, এই প্রশ্নটি তোমার দেশের সরকার ও প্রধানমন্ত্রীকে করা উচিত। আমরা মনে করি, সীমান্ত ও এর নিয়ন্ত্রণরেখা পুরোপুরি মেনে চলা উচিৎ।’
এবার সার্ক নিয়ে প্রশ্ন করে সুহাসিনী প্রধানমন্ত্রীর কাছ থেকে তাদের কাঙ্খিত জবাব আদায়ের চেষ্টা করেন। কিন্তু এবারো ব্যর্থ তিনি। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে প্রশ্ন করেন-
পাকিস্তানে উদ্ভূত সন্ত্রাসবাদই কি সার্কে বাংলাদেশে অংশ না নেওয়ার কারণ নয়?
জবাবে শেখ হাসিনা বলেন, ‘পাকিস্তানের পরিস্থিতিকে কেন্দ্র করে আমরা সার্ক সম্মেলন বর্জনের সিদ্ধান্ত নিয়েছি। সন্ত্রাসবাদের কারণে সেখানকার সাধারণ মানুষ সবচেয়ে বেশি ভুগছে। সে সন্ত্রাসবাদ সব জায়গায় ছড়িয়ে পড়েছে। আর সেকারণে আমরা অনেকে পাকিস্তানের ওপর হতাশ হয়ে পড়েছি। ভারত-পাকিস্তানেরও দ্বিপাক্ষিক সমস্যা রয়েছে এবং আমি সে ব্যাপারে মন্তব্য করতে চাই না। উরির হামলার কারণে ভারত সার্ক বর্জন করেছে। কিন্তু বাংলাদেশের ক্ষেত্রে কারণটা ভিন্ন।’
প্রধানমন্ত্রী আরো বলেছেন, ‘আমাদের সরে আসার প্রধান কারণ(সার্ক সম্মেলন থেকে) মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচারপ্রক্রিয়া নিয়ে পাকিস্তানের ভিত্তিহীন সমালোচনা। ওই বিচারে জামায়াতে ইসলামীর প্রায় এক ডজন নেতা একাত্তরের মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে অভিযুক্ত হয়েছেন।’
তিনি বলেন,‘পাকিস্তানের সঙ্গে সব কূটনৈতিক সম্পর্ক ছিন্ন করার জন্য আমার ওপর ব্যাপক চাপ রয়েছে। কিন্তু আমি বলেছি সম্পর্ক থাকবে। আমরা পারস্পরিক বিরোধ মীমাংসা করে নেবো।’
প্রধানমন্ত্রী এই কয়েকটি লাইনে যা স্পষ্ট করলেন তা হলো-
১.বাংলাদেশ তার নিজস্ব কারণে সার্ক সম্মেলন বর্জন করেছে, উরি হামলার কারণে নয়।
২. ভারত-পাকিস্তানের দ্বিপাক্ষিক সমস্যা নিয়ে বাংলাদেশ আগ্রহী নয়।
৩.পাকিস্তানের সন্ত্রাসবাদ ছড়িয়ে পড়ছে, যা বাংলাদেশকে হতাশ করেছে।
৪. পাবিস্তানের সঙ্গে কূটনৈতিক সম্পর্ক থাকবে। বিরোধ দ্বিপাক্ষিকভাবে মীমাংসা হবে।
এখানে প্রধানমন্ত্রী দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক বা সংকেটর মধ্যে তৃতীয় পক্ষকে স্পষ্ট না করে দিয়েছেন। তিনি জানিয়ে দিয়েছেন, যার যার দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক তার তার। সেখানে তৃতীয় পক্ষের কোনো প্রয়োজন নেই। যদিও প্রশ্নকারী তিন পক্ষ, এমনকি চারপক্ষকে(মিয়ানমার) জড়িয়েছেন তার কাঙ্খিত উত্তর পেতে। আর এটা করতে গিয়ে দ্য হিন্দুর কুটনৈতিক সম্পাদক সুহাসিনী নানা চাল চেলেছেন। কিন্তু প্রধানমন্ত্রী যেভাবে জবাব দিয়েছেন তাতে আমার কাছে ওই কূটনৈতিক সম্পাদককে প্রধানমন্ত্রীর বিপরীতে কূটনীতিতে একজন ‘শিশু’ বলে মনে হয়েছে।

%e0%a6%a4%e0%a6%a4%e0%a6%a6%e0%a6%a6%e0%a6%a6
এবার আমি চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং-এর সফর প্রসঙ্গে
হিন্দুর সাংবাদিক প্রশ্নের মধ্যেই অভিযােগ করেন, বাংলাদেশ চীনের প্রতি বেশি মাত্রায় ঝুঁকছে-
জবাবে প্রধানমন্ত্রী বলেন,‘ আপনারা ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যকার ভালো সম্পর্কের কথা বলেছেন। আপনাদের যদি সেটা মনে হয়ে থাকে, তাহলে বাংলাদেশ চীনের দিকে ঝুঁকছে বলে কী করে অভিযোগ করতে পারেন? না, আমাদের নীতিমালা খুব পরিষ্কার। আমাদের প্রত্যেকের সঙ্গে ভালো সম্পর্ক রয়েছে এবং আমরা তা বজায় রাখতে চাই।’
চীনের সঙ্গে বাংলাদেশের বাণিজ্য ভারতের তুলনায় বেশি। হিন্দুর সাংবাদিক তা নিয়েও নাখোশ।
আর প্রধানমন্ত্রী তার জবাবে বলেছেন,‘ এটি বেসরকারি খাতের ওপর নির্ভর করে। কোন দেশ থেকে তারা পণ্য কিনতে চায় তা তারাই নির্ধারণ করে।’
‘আমি বিশ্বাস করি সুসম্পর্কের জন্য কানেকটিভিটি খুব গুরুত্বপূর্ণ। আমরা বিআইএন নেটওয়ার্ক স্থাপন করেছি এবং এর ফলে ভুটান, ভারত এবং নেপালের সঙ্গে সম্পর্ক ভালো হয়েছে। চীন, ভারত আর মিয়ানমারের সঙ্গেও আমরা বিসিআইএম অর্থনৈতিক করিডোর স্থাপন করেছি যেন আমরা সবাই একসঙ্গে হয়ে নিজেদের মধ্যে বাণিজ্য বাড়াতে পারি। আর তাতে আমাদের জনগণের অর্থনৈতিক অবস্থা ভালো হবে। আমাদের জনসাধারণের ক্রয়ক্ষমতা বাড়বে। আর তাতে আমাদের অঞ্চলে সবচেয়ে লাভবান কে হবে? ভারত।’
প্রধানমন্ত্রী আরো বলেছেন,‘ অতীতে আমরা ভারত থেকে খাদ্যশস্য আমদানি করতাম, কিন্তু এখন আমাদের প্রয়োজনমাফিক খাদ্যশস্য রয়েছে। আর তাই বাণিজ্য কমে যাওয়ার ক্ষেত্রে সেটি একটি কারণ হতে পারে। কিন্তু আমাদের অনেক অভোগ্য পণ্য, মেশিন, তুলা এখনও ভারত থেকে আমদানি হচ্ছে। আমাদের সম্পর্ক ভালো এবং তা ক্রমাগত বাড়বে।’
আর এখানে প্রধানমন্ত্রী প্রধানত: চারটি বিষয় স্পষ্ট করেছেন
১.বেসরকারী খাতের ওপর তিনি নিয়ন্ত্রণ আরোপ করতে চাননা। তারা স্বাধীনভাবে আন্তর্জাতিক বাণিজ্য করবেন এটা তিনি চান।
২.কানেকটিভিটিকে তিনি খুবই গুরুত্বপূর্ন মনে করেন।
৩. একক কোনো দেশের ওপর নির্ভরশীলতা কমাতে চান।
৪.তিনি চান আঞ্চলিক বাণিজ্য, যোগাযোগ ও সম্পর্ককে আরো ঘনিষ্ঠ করতে।
প্রধানমন্ত্রী এখানে যা বলেছেন তা হলো আধুনিক চিন্তা এবং দেশের আধুনিক পররাষ্ট্রনীতি। এখন যুদ্ধের কূটনীতি নয়, এখন সময় বাণিজ্য এবং বিনিয়োগের কূটনীতি। আর এই কূটনীতির বৈশিষ্ট্য হলো কারুর অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ না করে ব্যবসা বাণিজ্য বাড়ানো। একটি উইন উইন অবস্থা তৈরি করা। সবাইকে লাভবান করে সবার ব্যবসা বাণিজ্য বাড়ানো। যদি আধিপত্যবাদী মানসিকতা ত্যাগ করা যায় তাহলে এটা সম্ভব।

10523773_10152797043603918_209715591569473240_n

সুহাসিনী হায়দার

আরো যা বলতে চাই
দ্য হিন্দু’র কূটনৈতিক সম্পাদক সুহাসিনী হায়দার প্রশ্নগুলো এমনভাবে করেছেন যা আধুনিক সাংবাদিকতার নীতিমালা বিরোধী। তিনি বারবার লিডিং প্রশ্ন করেছেন। এর মানে হলো প্রশ্নকর্তাই একটি মন্তব্য করে সেই মন্তব্যের পক্ষে সম্মতি আদায়ের চেষ্টা করেছেন। ব্যর্থ হয়ে তিনি বার বার লিডিং প্রশ্ন করেছেন। কৌশলে একই প্রশ্ন নানা ভাবে ঘুরিয়ে করেছেন। কিন্তু তিনি যে মিশন নিয়ে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সাক্ষাৎকার নিতে এসেছিলেন তা কার্যত ব্যর্থ হয়েছে, তিনি ব্যর্থ হয়েছেন। কিন্তু প্রধানমন্ত্রী তার জবাবে একজন যোগ্য রাষ্ট্রনায়কের মত বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতিকে সব দিক দিয়ে স্পষ্ট করেছেন। বুঝিয়ে দিয়েছেন বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতি বাংলাদেশেরই। এনিয়ে অন্য কোনো দেশের অহেতুক চিন্তা করার দরকার নেই।
তাই হতাশ দ্য হিন্দু একটি অনাড়ি বা অপেশাদার শিরোনাম করেছে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সাক্ষাৎকার নিয়ে-We feel frustrated with Pak., says Hasina ( আমরা পাকিস্তান নিয়ে হতাশ, বললেন হাসিনা)

শেখ হাসিনার পুরো সাক্ষাৎকার-(ইংরেজি)
শেখ হাসিনার পুরো সাক্ষাৎকার-(বাংলা অনুবাদ)
কলাবাগান, ঢাকা
১৪.১০.২০১৬

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s