অভিজিতের বাবা অধ্যাপক অজয় রায়কে যেভাবে মেরে ফেলা হয়েছিল!

df5b6a065c51b2c2b778aa1156eae865-6-1

ব্লগার অভিজিৎ রায়ের বাবা অধ্যাপক অজয় রায়

হারুন উর রশীদ:
বাংলাদেশে ‘গৃহপালিত’ এবং ‘চোরাই সাংবাদিকতা’র আরো একটি উদাহরণ সৃষ্টি হলো। আর তা সৃষ্টি হয়েছে অধ্যাপপক অজয় রায় এবং কমরেড অজয় রায়ের মৃত্যু সংবাদ নিয়ে। দুপুর ১২ টা পর্যন্ত নিহত ব্লগার ড. অভিজিৎ রায়ের বাবা অধ্যাপক অজয় রায়কে কিছু সংবাদ মাধ্যম মেরে ভুত বানিয়ে দিয়েছিল। তবে দুপুরের পর তারা তাকে জীবন্ত করে তুলেছেন। খবরটি সরিয়ে নতুন খবর দিয়েছেন, বর্ষিয়ান রাজনীতিবিদ কমরেড অজয় রায় মারা গেছেন।
অভিজিতের বাবা অধ্যাপক অজয় রায়ের মৃত্যুর খবর দিয়েছে বেশ কয়েকটি অনলাইন পত্রিকা এবং কয়েকটি দৈনিকের অনলাইন সংস্করণ। আর এই ভুয়া খবর প্রকাশের জন্য এখন পর্যন্ত তাদের কাউকে পাঠকদের কাছে দু:খ প্রকাশ বা ক্ষমা চাইতে দেখা যায়নি। তারা শুধু একই লিংক-এ কৌশলে ভুয়া খবরটি পরিবর্তন করে সত্যিকার খবরটি পেস্ট করে দিয়েছেন। এবং ধারণা করি কমরেড অজয় রায়ের খবরটিও তারা অন্যকোনো সংবাদ মাধ্যম থেকে কপি করেছেন। সত্য মিথ্যা যাই হোক কপি পেস্টেই তাদের আস্থা। এখন যদি জানা যায় কোন সংবাদ মাধ্যম বলছে কমরেড অজয় রায়ও মারা যাননি। তাহলেও এই খবরটিও তারা আবার কপি পেস্ট করবেন।
কপি-পেস্ট সাংবাদিকতার আমি নাম দিয়েছি চোরাই সাংবাদিকতা। আপনারা কেউ ভিন্ন নামও দিতে পারেন। তবে তাতে ঘটনার হেরফের হবে বলে মনে হয়না। আর ‘গৃহপালিত সাংবাদিকতা’ নামেও একটি শব্দ আমি ব্যবহার করেছি। এর মানে হলো কারুর কাছ থেকে কিছু শুনে চেক না করেই ঘরে বসে প্রতিবেদন তৈরি’র সাংবাদিকতা। একে হোম মেড সাংবাদিকতাও বলা যায়।

untitledoo
ভুয়া খবরটি যেভাবে তৈরি হলো
যেসব সংবাদমাধ্যম অভিজিতের বাবা অধ্যাপক অজয় রায়ের মৃত্যুর সংবাদ পরিবেশন করেছেন তারা সবাই তথ্যসূত্র হিসেবে ছাত্রমৈত্রীর সাবেক সভাপতি বাপ্পাদিত্য বসুর নাম উল্লেখ করেছেন। ভোরে কমরেড অজয় রায়ের মৃত্যুর পর বাপ্পাদিত্য তার পরিচিত সাংবাদিক এবং সংবাদ মাধ্যমকে মোবাইল ফোনে এসএমএস পাঠিয়েছিলেন। আর তাতে তিনি লেখেন-

screenshot_2016-10-17-13-51-23

Aged Politician Comrade Ajoy Roy, President of Sammilito Samajik Andolon & Coordinator of Samprodayikota o Jongibad Birodhi Mancha is no more. He has passed away at 5am today at his residence in Dhanmondi. His dead body will be at Central Shaheed Minar on 19 October 10am to pay homage.
Reagards- Bappaditya Basu.

এই টেক্সট মেসেজে কোথাও লেখা নেই যে অভিজিতের বাবা অধ্যাপক অজয় রায় মারা গেছেন। স্পষ্টই লেখা আছে বর্ষিয়ান রাজনীতিবিদ এবং সম্মিলিত সামাজিক আন্দোলন এবং সাম্প্রদয়িকতা ও জঙ্গিবাদ বিরোধী মঞ্চের নেতা কমরেড অজয় রায় আর নেই।
আমি এনিয়ে বাপ্পাদিত্য বসুর সঙ্গে কথাও বলেছি। তিনি আমাকে জানান,‘ আমি সাংবাদিক এবং পরিচিত জনদের এসএমএসটি দিয়েছি। কিন্তু তাতে স্পষ্ট করেই কমরেড অজয় রায়ের পরিচয় দেয়া আছে। তারপরও দু’একটি সংবাদ মাধ্যম বিভাবে আমাকে উদ্ধৃত করে নিহত ব্লগার অভজিৎ রায়ের বাবার মৃত্যুর সংবাদ পরিবেশন করলো বুঝতে পারছিনা।’
ঠিক কী হয়েছে আমি জানিনা। তবে আমার মনে হয়, কোনো একটি সংবাদ মাধ্যম এই এসএমএস পেয়ে আর অপেক্ষা করেনি। তারা ভেবেছে এই অজয় রায় অভিজিতের বাবা অজয় রায় ছাড়া আর কে হবেন! দেশেতো আর কোনা ‘বিখ্যাত অজয় রায়’ নাই! তাই এসএমএস-এ অজয় রায় নামটি পেয়ে বাকিটা নিজ গুণে টেবিলে বসে বানিয়ে দিয়েছেন। অতিরিক্ত তথ্য নিজ দায়িত্বে যোগ করে অভিজিতের বাবার মৃত্যু নিশ্চিত করতে যা যা করার করে দিয়েছেন। যিনি এসএমএস করেেছন সেই বাপ্পাদিত্যকে একবার ফোন করে নিশ্চিত হওয়ার প্রয়োজনও মনে করেন নাই।
আর খবরটি যখন আপ হলো বাকিরা আরো এক কাঠি এগিয়ে। কোন চিন্তা না করেই চোখ বুজে কপি পেস্ট করে দিলেন। তাই যারা এটা করেছেন তাদের সবার খবরও এক, সোর্সও এক। এবার তাহলে আমি নিশ্চয়ই বোঝাতে পেরেছি গৃহপালিত সাংবাদিকতা এবং তার ফলোয়ার চোরাই সাংবাদিকতার আলস কথা!

jjkk

 

বিদেহী আত্মার কল্যাণ কামনা!
আবার এই ভুয়া খবরের কী প্রতিক্রিয়া হয়েছে এবার তা শুনুন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন  শিক্ষক অভিজিতের বাবা অজয় রায়ের মৃত্যুর খবর শেয়ার করেন একটি অনলাইন নিউজ পোর্টাল থেকে। সেখানে আবার অনেকে বিদেহী আত্মার কল্যাণ কামনা করে ফেলেন। কেউ বলে ফেলেন,‘ ছেলের শোকে বাবাও চলে গেলেন।’
আমার এক বন্ধু আবার সেই খবর শেয়ার করে অধ্যাপক অজয় রায়ের সঙ্গে তার ব্যক্তিগত কিছু স্মৃতিও তুলে ধরেন। মোটমুটি খবরের ধাক্কায় শেষকৃত্য’রও হয়তো কেউ প্রস্তুতি নিয়ে ফেলেছিলেন হয়তো! তবে আমি জানিনা অধ্যাপক অজয় রায়ের কী প্রতিক্রিয়া হয়েছে তার নিজের মৃত্যুর খবর শুনে(যদি শুনে থাকেন)।

%e0%a6%ac%e0%a6%b8%e0%a6%95%e0%a6%95%e0%a6%95%e0%a6%a4%e0%a6%a4%e0%a6%a6

 

তারপরও চুপ

এই যারা অভিজিৎ রায়ের বাবা অধ্যাক অজয় রায়কে প্রথমে মেরে ফেলে পরে বাঁচিয়ে তুললেন তারা কেউই কিন্তু সেটা স্বীকার বা দু:খ প্রকাশ করলেন না। এমনকি তারা নতুন করে জানালেনও না যে অধ্যাপক অজয় রায় বেঁচে আছেন না মরেই আছেন। শুধু কেউ রিপোর্টটি সরিয়ে নিয়েছেন। আবার কেউ একই লিংক কমরেড অজয় রায়ের মৃত্যুর খবরটি পেস্ট করেছেন আগে অধ্যাপক অজয় রায়ের মৃত্যুর ভুয়া খবরটি ডিলিট করে। বাহ ভাবখানা এমন মাথা গুঁজে থাকলে কেউ দেখবেনা। আমরাতো আর করিনি । আমরা কপি-পেস্ট করেছি। আমাদের কী দোষ!
একটি সাধারণ প্রশ্ন
এই ধরণের সাংবাদিকতার কারণ কী। এর উৎস কী? এর পরিণতি কী? এসব নিয়ে বিস্তর আলাপ আলোচনা হচ্ছে। আরো করা যাবে। তবে আমি একটি প্রশ্ন করতে চাই। আর তা হলো ডাক্তারর যখন জীবিত নবজাককে মৃত ঘোষণা করেন তখন আমরা বিচার চাই, মামলা করি। কিন্তু কোন সংবাদ মাধ্যম যখন জীবিত ব্যক্তিকে মেরে ফেলে তার বিচার কি আমরা চাইবো না?
কলাবাগান, ঢাকা
১৭.১০.২০১৬

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s