‘ধর্ষণের শিকার’ মোল্লারহাটের সেই সংখ্যালঘু নারীর সাক্ষাৎকার (অডিও)

 

untitled

হারুন উর রশীদ:

ঘটনাটি বাগেরহাট জেলার মোল্লাহাট উপজেলার এক গ্রামে ৩০ সেপ্টেম্বর রাতের। আর খবর প্রকাশ হয়েছে ১৫ দিন পর ১৪ অক্টোবর । শিরোনাম ‘স্বামীকে বাঁচাতে ধর্ষকের তলোয়ারের কোপে গৃহবধুর পা কর্তন’। একই ঘটনার আরেকটি শিরোনাম ‘ বাগেরহাটে ১৫ দিন ধরে সংখ্যালঘু এক গৃহবধুকে ধর্ষণ!’ সংবাদ মাধ্যমে এরইমধ্যে এনিয়ে আরো অনেক খবর প্রকাশ হয়েছে। সেই গৃহবধুর স্বামী, পুলিশসহ নানা পক্ষের বক্তব্য প্রকাশ করেছে সংবাদমাধ্যম। তবে এই প্রথম যাকে নিয়ে এই ঘটনা সেই নারীর অডিও সাক্ষাৎকার গ্রহণ করেছি। তার নাম ঠিকানা প্রকাশ করা হলোনা নীতিমালার কারণে।

সেই নারীর মুখেই শুনুন সেই ঘটনা-
-ঘরেই ছিলাম। একটি ছেলে ঘরে ঢোকে। আমার স্বামী বাধা দেয় । বাধা দিলে আমার স্বামীকে দেয় কোপ। সেই কোপ আমার পায়ে লাগে। আমি অজ্ঞান হয়ে যাই।
ওই ছেলেটা আসলো, মানে কিভাবে আসলো, ঢুকলো কিভাবে?
-আমার স্বামী বাইরে গিয়েছিলো। দুই তিনটা দরজা। একটা খোলা ছিলো। সেখান থেকে ঢুকছে। টের পাই নাই।
ছেলেটির নাম কী?
-সোবাহান
তাকে কি চেনেন আপনি? পাশের বাড়ির? না দূরের?
-পাশের বাড়ির সাইডে, বেশি দূর না।
তারপর আপনার স্বামী উপরে গিয়েছিল?
-হ্যা আমরা শুয়েছিলাম। কারেন্ট চলে গেছে উপরে গিয়ে জানলা খুলে শুয়েছিলাম।
আপনার স্বামী গিয়ে কী দেখলো?
-যাইয়া দেখছে আমাকে জোর জুলুম করছিলো, টানাটানি করছিলো। তারপর সে বাধা দেয়। বাধা দিলে অমনি ওরে কোপ ছাড়িছে। আমি তখন দেখি কি দিয়ে কি হয়। আমি এগোতে গেছি। এগিয়ে গিয়ে ঠেকিয়ে দিয়েছি। ঠোকাতে গেলা সেই ছোরা লাগে আমার। সাথে সাথে আমি সিড়ি দিয়ে গড়িয়ে পরে যাই। আমি বলি আমি আর নাই। আমার শেষ হয়ে গেছে সব। এপর কোন সময় কি করেছে আমার মনে ছিলোনা।
জোর জুলুমের আগে কী করেছে আপনাকে?
ভয় দেখাইছে। বলেছে কথা না শুনলে তোকে মারব। তোর স্বামীকে মারব। তোর ছেলেকে মারব।…
না, ওই দিন রাতে ঢুকে কী করেছে আপনাকে?
-ঢুকে কয় কথা বলবিনা…
ভয় ভীতি ছাড়া আর কিছু করেছে কিনা?
-গায় হাত তোলা তুলি হয়েছে। কাজ করতে গেছে। সেময় আমার স্বামী চলে এসেছে। এর পর সে স্বামীকে জাতা (আঘাত) দিয়েছে। যেমনি যাতা দিছে অমনি সামনে গেছি। কোপ লাগছে আমার।
আপনার স্বামী বলেছেন আপনি আর সে পাশাপাশি বসেছিলেন?
-আমার স্বামীকে যেই দেখেছে তখন সে উঠে বসেছে। বসার পর স্বামী…
আপনাকে যখন জোর জুলুম করলো আপনি চিৎকার করলেন না কেন?
-মুখ আটকাইয়া রাখছিলো। কিভাবে করবো…
আপনারা হাসপাতালে যাননি কেন?
আমাদের এক চেনা লোক আছে। হাসপাতালে নার্সের চাকরি করে। ওই যায়গায় আইছিলাম।
মামলা করেননি কেন? এত পরে কেন মামলা করলেন?
-আমার যা অবস্থা আমারে বাঁচানোই প্রথম। আমারে না বাঁচাইয়া এইসব… আমাদের চারপাশে মোসলমান এলাকা। পাশে মোসলমান। আমার স্বামী, ভাসুর, দেওর এরা নরম মানুষ।
আপনি সোবাহানকে কতদিন ধরে চেনেন?
-চার পাঁচ মাস ধরে মাঝে মাঝে বলতো।
বড়ি কত দূর আপনাদের বাড়ি থেকে?
-বাড়ির সাইডে একটা রাস্তা আছে, রাস্তার ওই পাশে।
এর আগে কথা হয়েছে, না ওইদিনই প্রথম এসেছে?
-আগে কথা বলতো। কথা না শুনলে বলতো মারব, তোর ছেলে মারব, মেয়ে মারব, স্বামী মারব। আমি সব সময় বাধা দিতাম, এসমস্ত করিস কেন, খালি খালি।
আপনারা কী করেন? আপনার স্বামী কী করে?
-আমাদের ঘের, বাড়ি আছে।
ওরা কী করে? ওরা কী ধনী অনেক, না কৃষি করে?
-কিছু নাই। ওদের ওই ভিটি একটুক। দুই চার কাঠা জমি বাড়ি ছাড়া কিছু নাই।
এর আগেওতো সালিশ হয়েছিল। আপনার সোবাহানের বিরুদ্ধে নালিশ দিয়েছিলেন, সোবাহানরাও নালিশ দিয়েছিল?
-সলিশতো মানা করে। বাড়ির কাছে যাবিনা। তারপরও শোনে নাই।
ছোরাটা কি বাড়ি থেকে নিয়ে এসেছিলো?
-ছোরাটা আমি দেখি নাই। যে সময় কোপ মেরেছিলো সেই সময় মাজায় গোজা ছিলো।
তাহলে আপনি ভয় পেলেন কিভাবে? তার হাতে ছোরা আপনিতো দেখেন নাই?
-মাজায় গোজা ছিলো। যেসময় আসছে সে সময় দেখি নাই। যে সময় বাইর করছে সেময় দেখছি। বুঝছেন।
সোবাহান ঢুকে আপনাকে প্রথমে কী বললো, বেদয়াদবটা?
-কইলো কোনো শব্দ করবিনা। আমি কইছি তুই আইসিস কি জন্যে? আমার স্বামী রইছে ঘরে। সে বললো কোনো শব্দ করবিনা। শব্দ করলে কাইটা ফালাইয়া দেব।
তারপর?
-আমি বলছি না। সে বলে আমি যা বলবো তাই শুনবি। আমি বলি না। আমার স্বামী বাইরে গেছে , বাথরুমে গেছে, তুই নাম এখান থেকে।
তারপর?
-মুখ চেপে ধরে কাৎ করে শোয়াতে গেছে। আমি উঠে গেঠি। আবার কাৎ করে শোয়াতে গেছে। এরমধ্যে আমার স্বামী এসেছে।
তারপর?
-আমার স্বামী বাধা দেয়। বাধা দিলে বলে শুয়ারের বাচ্চা কোনো শব্দ করবিনা।
তারপর?
-তারপর আমার স্বামী আবারো বাধা দেয়। মানা করলে সে আমার স্বামীকে কোপ দেয়। আমি তখন এগিয়ে গেছি সেই কোপ লাগছে আমার পায়ে। আমি পড়ে যাই। সিড়ি থেকে নীচে পড়ে যাই। পরে গিয়ে দেখি আমার পা দু’ভাগ হয়ে গেছে। আর পর আমার কোনো হুশ জ্ঞান ছিলনা।
কোপানোর পর কি ও আপনাদের বাড়িতে আর আসছিলো?
-না আমাদের বাড়িতে আসে নাই। আমি ভাই’র বাড়ি গিয়েছিলাম। ওইখানে গিয়েছিলো। ওইখানে গিয়ে হুমকি দিয়েছে।
আর ওইদিন কি ধর্ষণ করতে পেরেছে?
-ওইদিনতো ধরার সাথে সাথেই বাধা কিভাবে কী করবে?
নোট: এই নারী এখন গোপালগঞ্জের একটি ক্লিনিকে চিকিৎসাধীন। তার স্বামী বাদি হয়ে মোল্লারহাট থানায় ১৩ অক্টোবর মামলা করেছেন। মামলায় অনধিকার প্রবেশ, ভয়ভীতি দেখানো এবং গুরুতর যখমের অভিযোগ আনা হয়েছে।
পুরো অডিও সাক্ষাৎকারটি এখানে শুনুন-

কলাবাগান, ঢাকা
২১.১০.২০১৬

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s