প্রধানমন্ত্রীর যে কথা নিয়ে আলোচনা প্রয়োজন

sheikh-hasina

হারুন উর রশীদ:
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ২০ অক্টোবর জাতীয় প্রেসক্লাবে বঙ্গবন্ধু মিডিয়া কমপ্লেক্স-এর উদ্বোধন করেন।
প্রস্তাবিত এই ৩১ তলা কমপ্লেক্স-এর প্রতিটি ফ্লোরের আয়তন ১৯ হাজার ৮০০ বর্গফুট। কমপ্লেক্স-এর প্রথম ১০ তলা ব্যবহার করা হবে প্রেসক্লাবের জন্য। ১১ থেকে ২৮ তলা বিভিন্ন সংবাদপত্র, দেশি-বিদেশি সংবাদ সংস্থা, টেলিভিশন ও রেডিওকে ভাড়া দেওয়া হবে। ২৯ থেকে ৩১ তলায় প্রেসক্লাবের সদস্যদের জন্য থাকবে হেলথ ক্লাব, সুইমিং পুল, জিমনেশিয়াম, গেস্ট হাউস, ডাইনিং হল ও সিনেপ্লেক্স। এ ছাড়া চারতলা আরও একটি ভবন করা হবে। ওই ভবনে সাংবাদিকদের ইউনিয়ন অফিস, মিটিং রুম, শো-রুম, ডিসপ্লে সেন্টার এবং নামাজের ঘর থাকবে। কমপ্লেক্স-এ ১ হাজার ২০০ লোকের ধারণক্ষমতার একটি মিলনায়তনও থাকবে। ( সূত্র: দৈনিক প্রথম আলো)
এই সব খবর নিয়ে সাংবাদিক পাড়ায় এখন বেশ আলোচনা। কিন্তু প্রধানমন্ত্রী এই বিশাল স্থাপনার বাইরে আরেকটি কথা বলেছেন যা অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ। আমি মনে করি সাংবাদিকতার জন্য এমন গুরুত্বপূর্ণ কথা আর দ্বিতীয়টি নাই। আর তাঁর সেই কথাটি হলো-“ সংবাদপত্রের স্বাধীনতার চেয়ে সাংবাদিকদের স্বাধীনতা বেশি জরুরি”।
প্রধানমন্ত্রী তার কথার পিঠে তাৎক্ষনিক ২টি যুক্তিও তুলে ধরেছেন-
১.অনেক ক্ষেত্রে মালিক-সম্পাদক একই ব্যক্তি। এ কারণে চাইলেই সাংবাদিকেরা সবকিছু করতে পারছেন, তা নয়। তাই সাংবাদিকদের স্বাধীনতাই বেশি প্রয়োজন।
২.মালিক সম্পাদক হলে সাংবাদিকতার সুযোগটা সেখানে মাঝে মাঝে একটু বাধাগ্রস্ত হয়, তাতে কোনো সন্দেহ নাই।
প্রধানমন্ত্রীর এই ২টি যুক্তিকে বিশ্লেষণ করলে আরো কিছু যুক্তি বেরিয়ে আসে-
১.মালিকই সংবাদ ম্যাধমের নিয়ন্ত্রক। সম্পাদক থেকে শুরু করে আর সবাই মালিকের কাছে দায়বদ্ধ। তাই মালিকের নীতির বাইরে গিয়ে বা ইচ্ছার বিরুদ্ধে কোনো সংবাদ পরিবেশন সম্ভব নয়।
২.মালিক শুধুমাত্র সংবাদ বা সংবাদ প্রোডাক্ট বিক্রি করে অর্থ আয় করেন না, তার আরো অনেক স্বার্থ আছে। সংবাদ মাধ্যম তার সেই সব স্বার্থ রক্ষার হাতিয়ার।
৩. মালিক সংবাদ মাধ্যমে পুঁজি বিনিয়োগ করেন। আর বিনিময়ে চান মুনাফা। সেই মুনাফা অর্জনের চুড়ান্ত লক্ষ্যকেই প্রাধান্য দেন মালিক। অন্যকোনো নীতি বা আদর্শ তার কাছে ততক্ষণ পর্যন্তই গ্রহণযোগ্য, যতক্ষন পর্যন্ত তা মুনাফায় বাধা না হবে।
বর্তমান অবস্থায় বাংলাদেশে সংবাদমাধ্যম যত স্বাধীন হবে মালিক ততো শক্তিশালী হবে। কারণ সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা সাংবাদিকের স্বাধীনতা নিশ্চিত করেনা। মালিকের স্বাধীনতা নিশ্চিত করে। আর বাংলাদেশের বর্তমান সংবাদমাধ্যমের কাঠামোতে সাংবাদিকের স্বাধীনতা নিশ্চিত করা সম্ভব নয়। কারণ এই কাঠামোতে সাংবাদিকতা নিছক একটা চাকরি। সম্পাদকও চাকরি করেন। আর এই সংবাদ মাধ্যম-এর চাকরি চলে ওয়েজ বোর্ড অনুযায়ী,শ্রম আইন অনুযায়ী। যদি নিয়োগ পত্র না দিয়ে কাজ করানো হয় তাহলোতো আর কথাই নেই। কোনো আইনই মালিককে ধরতে পারবেনা।
প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, কোনো কোনো ক্ষেত্রে মালিক সম্পাদক একই ব্যক্তি হওয়ায় সাংবাদিকরা স্বাধীন হতে পারেন না। আর আমার মত হলো মালিক সম্পাদক আলাদা ব্যক্তি হলেও এখানে সাংবাদিকের স্বাধীনতা নিশ্চিত হয়না। কাঠামোগত পরিবর্তন ছাড়া সাংবাদিকের স্বাধীনতা নিশ্চিত করা সম্ভব নয়।
আর এটা যতদিন করা না যাবে ততদিন সংবাদ মাধ্যমের স্বাধীনতা মালিকের স্বাধীনতা সংহত করবে, ক্ষমতা সংহত করবে। সংবাদমাধ্যমকে ব্যবহার করে নতুন নতুন ব্যবসার দুয়ার খুলবেন মালিক। তাই সংবাদ মাধ্যমকে প্রকৃতই স্বাধীন করতে হলে প্রয়োজন সাংবাদিকের স্বাধীনতা। আর সেই স্বাধীনতা নিশ্চিত করতে হলে প্রয়োজন সম্পাদক থেকে সাংবাদিক ও সংবাদকর্মী নিয়োগ এবং বরখাস্তে মালিক পক্ষের ক্ষমতার ভারসাম্য।
এজন্য আমার কিছু প্রস্তাব –
১.সম্পাদক থেকে সাংবাদিক নিয়োগ করতে হবে পুলের মাধ্যমে। পিএসসির মত কোনো প্রতিষ্ঠান পরীক্ষা নিয়ে উত্তীর্ণদের দিয়ে পুল তৈরি করে দেবে। আর সেখান থেকেই নিয়োগ দিতে হবে। মালিক চাইলেই এর বাইরে থেকে নিয়োগ দিতে পারবেন না।
২. একটি স্বাধীন কমিশন বা কর্তৃপক্ষ থাকবে । মালিক চাইলেই এককভাবে কাউকে বরখাস্ত বা সাসপেন্ড করতে পারবেন না। সেটা করতে হলে কমিশনের অনুমোদন লাগবে।
৩.মালিক পক্ষকে স্বাধীন কর্তৃপক্ষের কাছে প্রমাণ করতে হবে সাসপেন্ড বা বরখাস্ত যাই করা হোক না কেন তা যথার্থ। এটা প্রমানের আগ পর্যন্ত শাস্তিমূলক ব্যবস্থা কার্যকরী হবেনা। তার মনে হলে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নিতে হলে মালিক পক্ষকে যথার্থ কারণ দেখিয়ে কমিশনের কাছে আবেদন করতে হবে।
৪. এই কমিশন বা স্বাধীন কর্তৃপক্ষ সরকার, মালিক প্রতিনিধি, সাংবাদিক প্রতিনিধি, গণমাধ্যম বিশেজ্ঞ, আইনজ্ঞ এবং সুশীল সমাজের প্রতিনিধিদের সমন্বয়ে গঠন করতে হবে।
৫. সাসপেন্ড বা বরখাস্তের ক্ষেত্রে যদি এমন হয়, যে প্রতিষ্ঠান নিয়ে ঘটনা সেই প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধি আছেন কমিশনে, তাহলে ওই বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেয়ার ক্ষেত্রে তাকে অন্তর্ভূক্ত করা যাবেনা।
এখন প্রশ্ন উঠতে পারে এটা দিয়ে মালিকের স্বেচ্ছাচারিতা হয়তো কমানো যাবে, কিন্তু সরকার যদি চাপ সৃষ্টি করে। সরকার যদি চায় কোনো সাংবাদিককে শায়েস্তা বা চাকরিহীন করতে তাহলে তা কি ঠেকানো যাবে? সরকার চাইলেতো আইনের কৌশলে সংবাদ মাধ্যমই বন্ধ করে দিতে পারে। এই প্রশ্নটি জটিল এবং বিবেচনার দাবী রাখে। এরজন্য আসলে প্রয়োজন সত্যিকারের আইনের শাসনের এক রাষ্ট্র কাঠামো।

newspaper-412452_960_720
তবে তারপরও আমি মনে করি এই ধরণের ব্যবস্থা সাংবাদিকের স্বাধীনতা নিশ্চিতে অনেক বড় ভূমিকা রাখবে। পেশাদার সাংবাদিকের সংখ্যা বাড়বে। আর গজিয়ে ওঠা সংবাদ মাধ্যমের মালিকরাও ধীরে ধীরে ‘সংবাদিকতা ব্যবসা’ বন্ধ করে অন্য ব্যবসায় মনোযোগী হবেন।
আমাদের সাধারণ একটা ধারণা আছে সাংবাদিকের নিরাপত্তা হুমকির মুখে পড়ে সরকার বা প্রভাবশালী কোন পক্ষের কারণে। সেটা কেউ অস্বীকার করে না। কিন্তু বাস্তবে সাংবাদিকের জন্য সবচেয়ে বড় হুমকি তার প্রতিষ্ঠানের মধ্য থেকেই সার্বক্ষনিকভাবে বহাল থাকে। আর সেটা হলো পেশাগত অনিশ্চয়তা বা চাকরি হারানোর ভয়। তাই সংবাদ প্রকাশ অথবা প্রকাশ না করা কোনো ক্ষেত্রেই সাংবাদিকের কিছু করার থাকেনা।  প্রতিটি সংবাদ মাধ্যমেই একটি গোষ্ঠী বা গ্রুপ তৈরি হয় যারা চাকরি চিরস্থায়ী করতে মালিক পক্ষের কাছাকাছি থেকে তাদের যেকোনো সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নে সদা প্রস্তুত থাকে। আর প্রচলিত নিয়োগ প্রক্রিয়ার সুবিধা নিয়ে মালিক তার নিজস্ব কিছু লোক নিয়োগ করে যারা সাংবাদিক নয়, কিন্তু সাংবাদিকের পদ দখল করে।
এখানে ‘সংবাদ প্রকাশ’ এবং ‘সংবাদ না প্রকাশ করা’- এই দু’টি প্রক্রিয়ার কথা আমি বলেছি। কারণ সংবাদ প্রকাশ করাও যেমন মালিকের স্বার্থ উদ্ধারের একটি পথ। তেমনি কোনো সংবাদ না প্রকাশ করা বা ব্ল্যাক আউট কারও মালিকের স্বার্থ উদ্ধারের আরেকটি পথ।
কেউ হয়তো এখন বলবেন তাহলেতো কোন বিনিয়োগকারীই আর সংবাদ মাধ্যমে বিনিয়োগ করতে চাইবেনা। তাদের হাতে যদি হায়ার-ফায়ারের নিরঙ্কুশ ক্ষমতাই না থাকে তাহলে তারা কেন প্রতিষ্ঠান চালাবেন। আমি মনে করি বিনিয়োগ করবেন, প্রতিষ্ঠান চালাবেন। কারণ সংবাদকে যদি একটি প্রোডাক্ট বিবেচনা করি তাহলে এই প্রেডাক্টটি যত ভালো এবং ভেজালমুক্ত হবে গ্রাহকের কাছে তার কদর বা চাহিদাও তত বেশি হবে। আর এটা নিশ্চিত করতে পারে স্বাধীন এবং পেশাদার সাংবাদিকতা। আখেরে স্বাধীন এবং পেশাদার সাংবাদিকরাই মালিককে তার বিনিয়োগ করা পুঁজির লাভের নিশ্চয়তা দিতে পারে। এই বাংলাদেশেই তার উদাহরণ আছে।
সংবাদমাধ্যমে বিনিয়োগকারীদের বড় একটি অংশ এই সত্য বুঝতে পারেন না। অথবা বুঝতে চাননা। সংবাদমাধ্যমকে যদি কেউ লক্ষ্য মনে না করে উপায় হিসেবে বিবেচনা করেন তাহলেতো সংবাদমাধ্যম আর সংবাদমাধ্যম থাকেনা।
আর একটি কথা বলে শেষ করি। কেউ হয়তো বলতে পারেন কর্পোরেট দুনিয়ায় ওই নিয়মে চলেনা। তবে আমার কথা হলো সব প্রতিষ্ঠানের চরিত্র এক নয়। সব পেশার ধরণও এক নয়। তাই যার যেটা চরিত্র তাকে সেটা বজায় রাখতে হয়, বজায় রাখতে দিতে হয়। তাই যদি না হবে তাহলে সব কিছুকে যন্তরমন্তর ঘরে ঢুকিয়ে দিলেইতো হয়, একই সুরে সবাই গান গাইবে , কথা বলবে।
তা হয়না। হয়না বলেইতো পুলিৎজার বিজয়ী মার্কিন নাট্যকার ও লেখক আর্থার মিলারের ভাল সংবাদমাধ্যমে এত আস্থা- “A good newspaper is a nation talking to itself.”
আর আমার আস্থা সাংবাদিকের স্বাধীনতায়। যা আর্থার মিলারের ভাল সংবাদ মাধ্যম উপহার দিতে পারে।
কলাবাগান, ঢাকা
০২.১১.২০১৬

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s